নিজস্ব প্রতিবেদক: বিসিএস ক্যাডার নন, নন প্রশাসনের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অথচ সরকারের শীর্ষ আমলাদের বদলি ও পদোন্নতির অলিখিত ‘নিয়ন্ত্রক’ তিনি! কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা শুল্ক গোয়েন্দার মতো সরকারের রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাঙ্ক্ষিত ও লাভজনক পদে পদায়নের প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এক অদৃশ্য মোড়ল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বদলি বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ডের নাম মোঃ ওবায়দুর রহমান। তিনি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার মাঝিকান্দা গ্রামের আব্দুল ছালামের পুত্র। কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা ছাড়াই রাজধানীতে বছরের পর বছর ধরে এই সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওবায়দুরের এই পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, বরিশালের যুগ্ম কমিশনার মোঃ মাজেদুল হক। বরিশাল থেকে কাঙ্ক্ষিত স্টেশন চট্টগ্রাম কাস্টমসে বদলি হতে ওবায়দুরের সাথে যোগাযোগ করেন তিনি। এই বদলি নিশ্চিত করার বিনিময়ে চুক্তি হয় মোট ৬০ লক্ষ টাকার।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, প্রায় দুই মাস আগে ওবায়দুর রহমান এই বিপুল পরিমাণ টাকা অগ্রিম উৎকোচ হিসেবে বুঝে নেন। তবে বিসিএস কর্মকর্তাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য তিনি এক অভিনব কৌশল বেছে নেন। টাকা নেওয়ার বিপরীতে ওবায়দুর নিজের স্বাক্ষর করা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এবং সমপরিমাণ টাকার ব্যাংকের সিকিউরিটি চেক মাজেদুল হককে প্রদান করেন। তদবির সফল না হলে টাকা ফেরতের গ্যারান্টি হিসেবে এই চেক ও স্ট্যাম্প দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধান বলছে, ওবায়দুরের এই কোটি কোটি টাকার ডেরায় জিম্মি হয়ে আছেন সরকারের বিভিন্ন স্তরের আরও অন্তত ৮ জন উচ্চপদস্থ বিসিএস কর্মকর্তা। গত দুই মাসে মাজেদুল হক ছাড়াও এই কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও একই কায়দায় বদলি ও পদোন্নতির কথা বলে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওবায়দুর। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই কাস্টমস ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা বলে জানা গেছে। টাকা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় বদলি হতে না পেরে এবং সরকারের গোয়েন্দা নজরদারির ভয়ে এখন এই কর্মকর্তারা ওবায়দুরের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ করা হয় অভিযুক্ত মোঃ ওবায়দুর রহমানের সাথে। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অন্তত একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
তবে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে ওবায়দুর দাবি করেন, “আমি কোনো বদলি বা তদবিরের জন্য টাকা নিইনি, এটি আমাদের ব্যক্তিগত লেনদেন।” তবে ব্যক্তিগত লেনদেনের বিপরীতে কেন তিনি নিজের স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের সিকিউরিটি চেক দিতে বাধ্য হলেন—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে একজন সাধারণ ব্যক্তি কীভাবে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছেন, তার পেছনে ঊর্ধ্বতন কোনো মহলের হাত রয়েছে কি না—তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।।
(প্রতিবেদনের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আগামী সংখ্যায়)