চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: আশেক ও ভক্তকুলের ‘আল্লাহু আল্লাহু’ ধ্বনি, ঐশী প্রেমের জিকির আর সুফি ঘরানার ছেমা সংগীতের হৃদয়স্পর্শী মূর্ছনায় চট্টগ্রামের পটিয়ায় সম্পন্ন হলো প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহ সুফি আব্দুল আজিম মাইজভান্ডারী (ক.)-এর ৬-মাসিক ফাতেহা শরিফ। একই সাথে মহাসমারোহে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ও জিকরে ছেমা মাহফিল।
গত রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) পটিয়ার হুলাইন সিকদার পাড়ার (নতুন বাড়ী) ঐতিহ্যবাহী আজিম মঞ্জিলে দিনব্যাপী এই আধ্যাত্মিক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকালের আলো ফোটার পর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত পুরো এলাকায় বিরাজ করছিল এক অপার্থিব ও অন্যরকম রূহোনি পরিবেশ।
মাইজভান্ডার দরবার শরিফের একনিষ্ঠ সেবক, ফানাফিশ্ শায়খ, খলিফায়ে গাউসুল আজম বাবাভান্ডারী (ক.) এবং রইছুল মোতায়াক্কেলীন মওলানা শাহ্সুফি ছৈয়দ আব্দুল ওহাব মাইজভান্ডারী (ক.)-এর আমৃত্যু ছায়াসঙ্গী এই মহান সাধকের স্মরণে আজিম মঞ্জিল প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছিল আশেকদের মিলনমেলায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সিকদার পাড়া।
মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন আজিম ভান্ডার দরবার শরিফের প্রধান উপদেষ্টা কামরুদ্দিন চৌধুরী। আজিম ভান্ডার দরবারের আওলাদ শাহাদাত হোসাইন রাসেলের উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই রূহোনি মজলিসে স্বাগত বক্তব্য রাখেন দরবারের অপর আওলাদ হুমায়ুন রশীদ জুয়েল।

মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওলাদে রাসুল (দ.), আওলাদে গাউসুল আজম, পীরে তরিকত হযরতুল আল্লামা মাওলানা সৈয়দ ইকবাল ফজল আল হাছানী আল হোসাইনী আল মাইজভান্ডারী (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী)। তাঁর নূরানী উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ভক্তদের হৃদয়ে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।
প্রধান অতিথি তাঁর মূল্যবান বয়ানে বলেন, “আজকের এই অশান্ত পৃথিবীতে সুফিবাদের ও মাইজভান্ডারী দর্শনের শিক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। মাইজভান্ডারী ত্বরিকার মূল কথাই হলো— মানবতা, পরমতসহিষ্ণুতা, অহংকার মুক্তি এবং অন্তরের পবিত্রতা। যতক্ষণ না আমাদের কলব বা অন্তর হিংসা, দ্বেষ আর লোভ থেকে মুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা প্রকৃত মোমেন হতে পারব না। নামাজ, রোজা, জিকির-আজকার তখনই সার্থক হবে, যখন আমাদের অন্তরে সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে।” তিনি আরও বলেন, “হযরত শাহ সুফি আব্দুল আজিম মাইজভান্ডারী (ক.) তাঁর পুরো জীবন গাউসুল আজম কেবলার ত্বরিকার খেদমতে এবং ছৈয়দ আব্দুল ওহাব মাইজভান্ডারী (ক.)-এর ছায়াসঙ্গী হিসেবে বিলীন করে দিয়েছিলেন। এটাই হলো প্রকৃত ‘ফানাফিশ্ শায়খ’ বা মোর্শেদের প্রেমে মগ্ন হওয়ার আদর্শ উদাহরণ। শুধু মুখে আশেক দাবি করলেই হবে না, ওলী-আল্লাহদের চরিত্র ও আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মাহফিলের ভাবগাম্ভীর্য আরও বাড়িয়ে তোলেন খলিল ভান্ডার দরবার শরিফের আওলাদ শাওন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান, সমাজসেবক ও ৫ নং হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ফজলুল কাদের, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আব্দুল আলি মজুমদার রান্টু, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রিয়াজুদ্দিন, সাংবাদিক ইকবাল উদ্দিন এবং নূর কাদের চৌধুরীসহ বিভিন্ন দরবারের সম্মানিত আওলাদবৃন্দ।
ভোরের আলো ফোটার পর বাদ ফজর পবিত্র খতমে কোরআনের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল ১১টায় ভক্ত ও আশেকানদের অশ্রুসিক্ত নয়নে রওজা মোবারকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর দুপুর ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় খতমে কোরআনের মোনাজাত, মিলাদ ও কিয়াম।
বাদ মাগরিব থেকে শুরু হয় মাহফিলের মূল আকর্ষণ। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত নূরানী মিলাদ মাহফিল ও তকরির পর্বে সুফিবাদের অমিয় বাণী বিলিয়ে দেন ওলামায়ে কেরামগণ। বিশেষ ওয়াজিন হিসেবে কোরআন, সুন্নাহ ও সুফি দর্শনের আলোকে হৃদয়গ্রাহী বয়ান পেশ করেন সিকদার পাড়া এবাদতখানার পেশ ইমাম ও হুলাইন হযরত এয়াছিন আউলিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক হারুনুর রশীদ, মওলানা মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, মওলানা ফারুক এবং মওলানা নুরুল আজিজ।
রাত ১১টায় আজিম মঞ্জিল প্রাঙ্গণ রূপ নেয় এক স্বর্গীয় আবহে। সুর ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য মিশ্রণে জিকরে ছেমা পরিবেশন করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ছেমা শিল্পী আহমদ নূর আমিরী। তাঁর কণ্ঠের জিকির আর ছেমার সুর তরঙ্গে উপস্থিত হাজারো ভক্তের চোখে অশ্রু নেমে আসে এবং এক অপার্থিব রূহোনি পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
অবশেষে রাত ২টায় মিলাদ, কিয়াম ও আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে এই মহা-আয়োজনের। মোনাজাতে দেশ, জাতি এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। অশ্রুসিক্ত চোখে বিশ্ববাসীর কল্যাণ চেয়ে ‘কোটি ভক্তের’ আমিন আমিন ধ্বনিতে শেষ হয় মোনাজাত। এরপর আগত দূর-দূরান্তের হাজারো মেহমানের মাঝে সুশৃঙ্খলভাবে তাবারুক বিতরণের মাধ্যমে শেষ হয় এই স্মরণীয় আধ্যাত্মিক মহাসমাবেশ।