ঝুলন দত্ত, নিজস্ব প্রতিবেদক: মঞ্চজুড়ে আলো, পায়ের ছন্দে নূপুরের ঝংকার আর অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে গল্প। দর্শকের চোখে তখন শুধু একজন নৃত্যশিল্পী। অথচ সেই কয়েক মিনিটের পরিবেশনার পেছনে থাকে বছরের পর বছর সাধনা, অনুশীলন, শৃঙ্খলা ও আত্মনিবেদন। চট্টগ্রামের পটিয়ার কর্ত্তালা গ্রামের মেয়ে প্রিয়াংকা বড়ুয়ার জীবনও তেমনই এক দীর্ঘ সাধনার গল্প।
নৃত্যকে ভালোবেসে প্রায় তিন দশক ধরে পথ চলছেন নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক প্রিয়াংকা বড়ুয়া। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য শিক্ষক এবং ‘নৃত্যরূপ একাডেমি’র পরিচালক। নিজের শিল্পচর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে নৃত্যের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করাই এখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

বাবা নিশীত কান্তি বড়ুয়া ও মা বীণা বড়ুয়ার তিন মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় প্রিয়াংকা। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। সেই শৈশবের আগ্রহই ধীরে ধীরে পরিণত হয় সাধনায়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা ওড়িশির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন তিনি। শরীরের ভঙ্গি, হাতের মুদ্রা, চোখের অভিব্যক্তি ও ছন্দের সমন্বয়ে গল্প বলার এই নৃত্যধারায় নিজেকে তৈরি করেন দীর্ঘ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে।
ওড়িশি নৃত্যচর্চায় তাঁর অন্যতম গুরু ছিলেন খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী প্রমা অবন্তী। গুরুর কাছ থেকে তালিম নেওয়ার পাশাপাশি নিজের চর্চা ও মঞ্চ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি করেন স্বতন্ত্র পরিচয়।
তবে প্রিয়াংকার পথচলা শুধু নৃত্যচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিল্পের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে এমবিএ সম্পন্ন করার পর ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। শিল্পচর্চার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার এই সমন্বয় তাঁর দীর্ঘ পথচলায় যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

মঞ্চে তাঁর পরিচিতিও তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে। ২০১৩ সালে চ্যানেল আইয়ের ‘সেরা নাচিয়ে’ প্রতিযোগিতায় সেরা সাতজনের মধ্যে জায়গা করে নেন প্রিয়াংকা বড়ুয়া। জাতীয় পর্যায়ের সেই অর্জন তাঁর নৃত্যজীবনে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়।
নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি প্রিয়াংকা। নৃত্যকে ছড়িয়ে দিতে গড়ে তোলেন ‘নৃত্যরূপ একাডেমি’। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে চট্টগ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণদের নৃত্য প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন তিনি। তাঁর হাত ধরে নৃত্য শিখেছেন শত শত শিক্ষার্থী। তাদের অনেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছে।
প্রিয়াংকার কাছে নৃত্য মানে কেবল মঞ্চে পরিবেশনা নয়। তাঁর কাছে এটি মানুষের সঙ্গে শিল্পের সংযোগ তৈরির একটি মাধ্যম।
তিনি বলেন, “নৃত্য আমার কাছে শুধু শিল্প নয়, একধরনের সাধনা। ভালোবাসা ও নিষ্ঠা নিয়ে এই শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন পথ চলতে হয়। আমি চাই নৃত্যের সৌন্দর্য ও নির্মল আনন্দ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এবং সংস্কৃতিমনা একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে।”
চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বড় বড় মঞ্চে তাঁর নেতৃত্বে নৃত্য পরিবেশিত হয়েছে। নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে নৃত্য পরিচালনার পাশাপাশি ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের নৃত্য পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
তবে জাতীয় পর্যায়ের মঞ্চ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের শিল্পকে তুলে ধরাই তাঁর পথচলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ২০২১ সালে বিশ্ব ওড়িশি উৎসবে অংশ নেন প্রিয়াংকা। এরপর ২০২৩ সালে ভারতের ওড়িশার ভুবনেশ্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ওড়িশি উৎসবেও অংশগ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত কোরিয়ান মাইম ফেস্টিভ্যালেও অংশ নেওয়ার সুযোগ আসে তাঁর।
চট্টগ্রামের একটি গ্রামের মেয়ে থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চের শিল্পী হয়ে ওঠার এই যাত্রা সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের অনুশীলন, মঞ্চে কাজ করার অভিজ্ঞতা, উচ্চশিক্ষা এবং নিজের শিল্পের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে বলে জানান প্রিয়াংকা।
তাঁর ভাষায়, “একজন শিল্পীর জন্য মঞ্চে ওঠা যেমন আনন্দের, তেমনি এর পেছনে কঠোর পরিশ্রমও থাকে। আমি মনে করি, শিল্পকে ভালোবাসলে প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। নিজের শেখার পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মকে শেখানোর মধ্যেই আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই।”
একজন শিল্পীর সাফল্য শুধু পুরস্কার, পরিচিতি কিংবা বিদেশের মঞ্চে অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়—প্রিয়াংকা বড়ুয়ার পথচলা যেন তারই উদাহরণ। নিজের শিল্পচর্চার পাশাপাশি তিনি তৈরি করছেন নতুন শিল্পী, গড়ে তুলছেন নৃত্যপ্রেমী প্রজন্ম এবং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।
তাই প্রিয়াংকা বড়ুয়ার গল্প কেবল একজন নৃত্যশিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি পটিয়ার করতালা গ্রামের এক মেয়ের স্বপ্ন, দীর্ঘ সাধনা, শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা এবং সেই স্বপ্নকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার গল্প। চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে আসা এই শিল্পীর নূপুরের ছন্দ আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পৌঁছে গেছে।
আর তাঁর পথচলার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সেখানেই—নিজে নৃত্য করার পাশাপাশি অন্যদের হাতেও তুলে দেওয়া নৃত্যের সেই ভালোবাসা, যার ধারাবাহিকতায় মঞ্চের আলোয় একদিন আরও অনেক নতুন প্রিয়াংকার আবির্ভাব ঘটবে।