রাসেল চৌধুরী : কারখানার বিশাল লোহার গেটটা আজ বন্ধ। যে সাইরেনের শব্দে প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙতো হাজারো শ্রমিকের, আজ সেখানে এক ভৌতিক নীরবতা। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেকে অবস্থিত এস. আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই বন্ধের ঘোষণায় কেবল একটি কারখানার চাকা থামেনি, থমকে গেছে হাজারো শ্রমিকের বেঁচে থাকার লড়াই, নিভে গেছে বহু পরিবারের স্বপ্ন আর চুলার আলো।
যে চিনিকল প্রতিদিন টন টন চিনি উৎপাদন করে দেশের মানুষের মুখ মিষ্টি করতো, আজ সেই কারখানার শ্রমিকদের জীবন বিষাদে ভরা। আকস্মিক এই বন্ধের খবরে মইজ্জারটেক এলাকায় নেমে এসেছে এক শোকার্ত অন্ধকার। কর্মসংস্থান হারিয়ে মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন শত শত শ্রমিক।
বছরের পর বছর ধরে যে কারখানাকে শ্রমিকেরা নিজেদের ঘরবাড়ি মনে করেছিলেন, আজ সেখানে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। নিয়মিত আয়ের পথটি এক নিমেষেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ চালানো, অসুস্থ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা, আর সন্তানদের স্কুলের বেতন দেওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
চোখের জল মুছতে মুছতে এক প্রবীণ শ্রমিক বলেন, "এই কারখানায় ঘাম ঝরিয়ে ১০টি বছর পার করেছি। আজ হঠাৎ শুনলাম কারখানা বন্ধ। মাস শেষে এখন কার কাছে হাত পাতবো? সন্তানদের মুখে কী তুলে দেবো? আমাদের অপরাধটা কী?"
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া মানে কেবল শ্রমিকদের বেকার হওয়া নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে পুরো একটি এলাকার অর্থনীতি। মইজ্জারটেক এলাকার ভ্যানচালক, রিকশাওয়ালা, ছোট চায়ের দোকানদার, মেসের মালিক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আজ দিশেহারা। কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রাণচঞ্চল এলাকাটি এখন এক মরা শহরে পরিণত হয়েছে। চায়ের দোকানে আড্ডার বদলে এখন কেবলই চাপা দীর্ঘশ্বাস।
হঠাৎ কাজ হারিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে যে হাহাকার আর হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়। এটি একেকটি জীবন্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি অথবা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও ক্ষতিপূরণ বুঝিয়ে না দিলে বহু পরিবার অনাহারের মুখে পড়তে বাধ্য।
একটি কারখানার দরজা বন্ধ হওয়া মানে কেবল লোহার গেটে তালা পড়া নয়, এটি হাজারো পরিবারের ভাগ্যের দুয়ারে তালা মারা। এখন প্রশ্ন হলো, এই অসহায় মানুষগুলোর দায়িত্ব কে নেবে? প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সাধারণ এই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি নিয়তির পরিহাসে এভাবেই হারিয়ে যাবে হাজারো শ্রমিকের রঙিন স্বপ্ন? মইজ্জারটেকের বাতাস এখন এই একটি প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে।