ঝুলন দত্ত : নিজস্ব প্রতিবেদক: বিজয়ার আবহে বিদায়ের সুর, উৎসবের রেশ আর শিল্পের অনন্য মেলবন্ধনে রাঙিয়ে উঠেছিল রাউজানের কোয়েপাড়া। শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমী উপলক্ষে গত ২১ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার, রাউজানের কোয়েপাড়া পল্লী সেবা সংঘে মঞ্চস্থ হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গীতি-নৃত্যনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। গ্রামের মাটি আর শহরে বসবাসরত কোয়েপাড়ার শিশু-কিশোরদের সম্মিলিত পরিবেশনায় প্রাণ পায় মানুষের অন্তর জয়ের এক চিরন্তন আখ্যান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ কেবল একটি গীতি-নৃত্যনাট্য নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের রূপান্তরের এক অনুপম শিল্পভাষ্য। যে হৃদয়ে একদিন ছিল নিষ্ঠুরতা, যে জীবনে ছিল অন্ধকারের দাপট, সেই হৃদয়েও একসময় জেগে উঠতে পারে সৌন্দর্য, মমতা ও সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা—এই শাশ্বত সত্যই নাটকের পরতে পরতে ফুটে উঠেছে।
অরণ্যের গভীরতা, দস্যুদের উন্মত্ততা, দেবী-দেবতার আবির্ভাব, ভয় ও প্রলোভনের নানা অধ্যায় পেরিয়ে নাটকটি পৌঁছে দেয় এক মহৎ উপলব্ধিতে—মানুষের অন্তরের জাগরণই সবচেয়ে বড় জয়। দস্যু রত্নাকরের ঋষি বাল্মীকিতে রূপান্তর তাই কেবল নাম বদলের গল্প নয়; এটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে, নিষ্ঠুরতা থেকে মানবিকতায় উত্তরণের এক চিরন্তন যাত্রা।

বিজয়া দশমীর আবেগঘন দিনে এই পরিবেশনা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, অশুভের বিনাশ শুধু বাইরের জগতে নয়, মানুষের নিজের অন্তরেও প্রয়োজন। আর সেই অন্তরের পরিবর্তনই পারে জীবনে সৌন্দর্য, শান্তি ও সৃষ্টির আলো ছড়িয়ে দিতে।
নাটকটির মূল পরিকল্পনা ও সার্বিক নির্দেশনায় ছিলেন শোভন সেন গুপ্ত এবং পরিচালনায় ছিলেন অসিত নন্দী। কোয়েপাড়ার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত শিশু-কিশোরদে। নিয়ে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক উদ্যোগে একদিকে যেমন ফুটে ওঠে রবীন্দ্রসাহিত্যের সৌন্দর্য, অন্যদিকে তেমনি প্রকাশ পায় নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা।
নাটকের প্রধান চরিত্রে বাল্মীকির ভূমিকায় উজ্জ্বল তালুকদার, বালিকার চরিত্রে আদৃতা নন্দী, মা কালীর ভূমিকায় বৃন্দা দে, মা সরস্বতীর ভূমিকায় বর্ষা ঘোষ এবং মা লক্ষ্মীর ভূমিকায় তিলোত্তমা সেনগুপ্ত অভিনয় করেন। দস্যু সর্দারের চরিত্রে অতিথি শিল্পী হিসেবে ছিলেন ইন্দ্রজিৎ ভট্টাচার্য।

দস্যু ও শিকারী দলের সদস্য ছিলেন স্বাগত, সৌম্য, শাশ্বত, সৌম্যদীপ, ইন্দ্রনীল, শ্রাবণ, দিব্য, দুর্জয়, শান্তনু ও অরিন্দম। ছোট পাখির ভূমিকায় সৃজা, আরোহী, হৃদিতা ও সপ্তর্ষি এবং হরিণশাবকের ভূমিকায় প্রিজয় ও অনুপম অংশ নেয়।
পল্লীকন্যার চরিত্রে অভিনয় করে নীলাদ্রি, তৃষাম, আনুষ্কা, অনন্যা, সায়ন্তিকা, আদ্রিকা, পুষ্পা ও অন্বি। বনদেবীর ভূমিকায় ছিলেন পৌষালী, আবৃতি, প্রথা, মাত্রা, মিঠি, মুনা, সুকন্যা, শ্রুতি, বৈশাখী ও জয়শ্রী।
গ্রামবাসীর চরিত্রে সুমি বৈদ্য, সোমা বিশ্বাস, প্রীতি দেব ও মনিকা দাশ গুপ্ত এবং ব্রাহ্মণ দম্পতির ভূমিকায় পিকলু চক্রবর্তী ও শুকলা আচার্য অভিনয় করেন।
নাটকের নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন বর্ষা ঘোষ, তিলোত্তমা সেনগুপ্ত ও সুমি বৈদ্য। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন সাধন দেব, রূপক বিশ্বাস, সনজিত নন্দী, রাসেল দেব, সৌমেন দেব, সৌরভ দেবরায়, শুকলা আচার্য, শিবানী চক্রবর্তী, মুক্তা তালুকদার, সংগীতা বিশ্বাস, প্রবীর দে, রবি বিশ্বাস, জুয়েল দেবরায়, জয় চৌধুরী ও আদর চক্রবর্তী। ভিডিওগ্রাফি ও ধারাবর্ণনায় ছিলেন শুভার্থী সেনগুপ্ত।

কোয়েপাড়ার শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে এই আয়োজন যেন প্রমাণ করে, সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে দিতে বড় আয়োজনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সম্মিলিত ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতা। রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সৃষ্টি ঘিরে এই পরিবেশনা শুধু একটি নাট্য আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং হয়ে উঠেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিল্প-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করার এক আন্তরিক প্রয়াস।
বিজয়ার দিনে দেবী দুর্গার বিদায়ের বেদনার সঙ্গে মিশে ছিল শিল্পের আনন্দ, সৃষ্টির আবেশ আর মানবিকতার জয়গান। ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র মধ্য দিয়ে কোয়েপাড়ার মঞ্চে যেন আবারও উচ্চারিত হলো সেই চিরন্তন বাণী—মানুষের হৃদয় বদলাতে পারে, অন্ধকার পেরিয়ে জ্বলে উঠতে পারে আলোর প্রদীপ।