রাসেল চৌধুরী: একটি দেশের লোকায়ত সঙ্গীতকে আমরা সাধারণত মাটির গন্ধমাখা, সহজ-সরল এবং আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ বলেই ভাবতে অভ্যস্ত। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া একটি মানুষ যখন তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় লেখা গানে এমন এক মহাজাগতিক দর্শন বুনে দেন, যা জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় বা যুক্তরাষ্ট্রের নৃবিজ্ঞানীদের টেবিল পর্যন্ত তাড়া করে ফেরে, তখন প্রচলিত লোক-গবেষণার ব্যাকরণ নতুন করে লিখতে হয়। তিনি আর কেউ নন, চাটগাঁইয়া লোক-সংগীতের ঈশ্বর এবং আধুনিক রূপকার আবদুল গফুর হালী ।
সাধারণত আমাদের দেশে আব্দুল গফুর হালীকে চাটগাঁইয়া চটুল গানের জনক কিংবা মাইজভাণ্ডারী মরমি ধারার সুরকার হিসেবে একরৈখিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় । তবে তাঁর গানের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক দর্শন ও ভাষাতাত্ত্বিক বিপ্লব নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে খুবই কম।
গফুর হালীর বিচ্ছেদী ও আধ্যাত্মিক গানের মূল ভিত্তি ছিল পরম সত্তার সাথে নিজের আত্মার মিলন । তাঁর নিজস্ব একটি দর্শন ছিল— ‘আমি এখানে নাই’ মানে ‘আমি অন্য কোথাও আছি’ । তিনি মানবজীবনকে বিনাশী ভাবতেন না, বরং আত্মানুসন্ধানের এক অবিরাম অমরণশীল যাত্রা মনে করতেন। দর্শনশাস্ত্রের ভাষায় যাকে ‘Transcendentalism’ বলা হয়, গফুর হালী প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই কেবল প্রকৃতির পাঠশালা থেকে সেই গভীর তত্ত্ব তাঁর গানে আত্মস্থ করেছিলেন।
কেবল গান নয়, আব্দুল গফুর হালী ছিলেন চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক ভাষায় পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনার প্রথম পথিকৃৎ । ‘গুলবাহার’, ‘নীলমণি’ কিংবা ‘আশেক বন্ধু’ নাটকগুলোর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, একটি আঞ্চলিক উপভাষাও (Dialect) মঞ্চনাটকের মতন জটিল এবং দীর্ঘ সংলাপে অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে । তিনি উপভাষাকে কেবল কৌতুক বা প্রহসনের উপাদান থেকে বের করে এনে সাহিত্যের মূল মঞ্চে জায়গা করে দিয়েছিলেন।
দেশীয় একাডেমীগুলোতে যখন তাঁকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার খরা চলছে, ঠিক তখনই তাঁর গানের গূঢ় অর্থ বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তোলে।
জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হান্স হার্ডার [গফুর হালীর মরমি ভাবদর্শনে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং দীর্ঘ গবেষণা শেষে জার্মান ভাষায় প্রকাশ করেন আস্ত একটি বই— ‘ডার ফেরুখটে গফুর স্প্রিখট’ (পাগলা গফুর বলে) [যেখানে হালীর ৭৬টি মাইজভাণ্ডারী ও মরমি গান জার্মান ভাষায় অনূদিত ও ব্যাখ্যায়িত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নৃবিজ্ঞানী পিটার জে. বার্টুসি এবং সঙ্গীত গবেষক ড. বেঞ্জামিন ক্রাকাউর তাঁর গানের সুরের বাঁধন এবং লোকজ মনস্তত্ত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করেছেন।
শেফালী ঘোষ ও শ্যमসুন্দর বৈষ্ণবের কালজয়ী জুটিকে যারা আজকের আসনে বসিয়েছেন, তাদের নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন গফুর হালী । দুই হাজারেরও বেশি গানের এই স্রষ্টা কেবল সুর বাঁধেননি, বরং মরমি সাধক আস্কর আলী পণ্ডিত এবং রমেশ শীলের ঐতিহ্যকে উত্তরপ্রজন্মের সাথে সংযুক্ত করার এক অটুট সেতু হিসেবে কাজ করেছিলেন।।
২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর এই সাধক চিরবিদায় নেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক পণ্ডিতেরা যাঁর সৃষ্টির গভীরতা পরিমাপ করতে সাতসমুদ্র পেরিয়ে আসেন নিজ দেশে সেই গফুর হালী এখনো একুশে পদকের মতন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতির অপেক্ষায় থেকে যান ।
তাঁর শুভ জন্মবার্ষিকীতে আমাদের প্রথাগত শ্রদ্ধাঞ্জলির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গফুর হালী কেবল চট্টগ্রামের আঞ্চলিকতার সমার্থক নন; তিনি বিশ্ব-লোকসঙ্গীতের মানচিত্রে বাংলাদেশের এক অনন্য এবং গভীর দার্শনিক কণ্ঠস্বর।